বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি
Biotechnology Or জৈবপ্রযুক্তি বা জীবপ্রযুক্তি হলো বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত নীতি অনুসরণ ও প্রয়োগ করে প্রানী/জীবদের ব্যবহার করার মাধ্যমে মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং ব্যবহারযোগ্য প্রয়োজনীয় বস্তু বা পদ্ধতি তৈরির বিশেষ প্রযুক্তি। বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি Biotechnology
জাতিসংঘের কনভেনশন অন বায়োলোজিক্যাল ডাইভার্সিটি অনুসারে জৈব প্রযুক্তিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়ঃ
যে কোনো প্রকারের প্রায়োগিক প্রাযুক্তিক কাজ যা জৈবিক ব্যবস্থা, মৃত জৈবিক বস্তু অথবা এর থেকে প্রাপ্ত কোনো অংশকে ব্যবহার করে কোনো দ্রব্য বা পদ্ধতি উৎপন্ন করে বা পরিবর্তন করে যা বিশেষ ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
জীব প্রযুক্তির জনক কে?
Karoly Ereky, একজন Hungarian Agricultural Engineer biotechnology নাম টা 1919 সালে প্রথম দেন এবং এনাকেই জীবপ্রযুক্তি র জনক বলা হয়। বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি Biotechnology
বায়োটেকনোলজির প্রয়োগ
৪টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে
- স্বাস্থ্য
- কৃষি
- শিল্পে শস্য ও অন্যান্য পণ্যের (যেমন: জৈবিক উপায়ে পচনশীল প্লাস্টিক, উদ্ভিজ্জ তেল, জৈব জ্বালানি) ব্যবহার
- পরিবেশক
জৈবপ্রযুক্তির বিভিন্ন শাখা
জৈবপ্রযুক্তির বিভিন্ন শাখাকে শনাক্ত করার জন্য কিছু শব্দ বা পরিভাষা উদ্ভূত হয়েছে। যেমন:-
- গোল্ড বায়োটেকনোলজি বা স্বর্ণ জৈবপ্রযুক্তি
এই শাখাটি মূলত বায়োইনফরমেটিকসের উপরে ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে যা জৈবপ্রযুক্তির একটি আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র যেখানে জীববিজ্ঞানের সমস্যাগুলো দ্রুত সাজানো যায় এবং তথ্য বিশ্লেষণ করা যায় কম্পিউটারের প্রযুক্তি ব্যবহার করে।এ টি অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- functional genomics, structural genomics and proteomics যা জৈবপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পের মূল উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে।
- ব্লু বায়োটেকনোলজি বা নীল জৈবপ্রযুক্তি
মূলত সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে শিল্পক্ষেত্রে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্র। যেমন- জৈব জ্বালানি পরিশোধনের ক্ষেত্রে সালোকসংশ্লেষণকারী মাইক্রো-শৈবাল ব্যবহৃত হয়।
- গ্রিন বায়োটেকনোলজি বা সবুজ জৈবপ্রযুক্তি
জৈবপ্রযুক্তির সেই শাখা, যেখানে জৈবপ্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। যেমন- মাইক্রোপ্রোপাগেশনের মাধ্যমে একসাথে অনেক উদ্ভিদ উৎপন্ন করা যায়। নির্দিষ্ট পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ (বাইরে থেকে জিন প্রবেশ করানোর মাধ্যমে উৎপন্ন উদ্ভিদ) তৈরি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী এবং অধিক ফলনশীল উদ্ভিদ উৎপাদন।
- রেড বায়োটেকনোলজি বা লাল জৈবপ্রযুক্তি
চিকিৎসা শাস্ত্র এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি। এই শাখার অন্তর্গত কাজগুলো হল টিকা ও অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি, বিভিন্ন থেরাপি, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি, কৃত্রিম হরমোন তৈরি, স্টেম কোষ প্রভৃতি তৈরি।
- হোয়াইট বায়োটেকনোলজি বা সাদা জৈবপ্রযুক্তি
এটিকে শিল্প জৈবপ্রযুক্তিও বলা হয় কারণ এই প্রযুক্তি শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যেমন- বিভিন্ন এনজাইমের সঠিক ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ তৈরি এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ধ্বংস করা হয়।
- ইয়োলো বায়োটেকনোলজি বা হলুদ জৈবপ্রযুক্তি
খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি।যেমন- গাঁজন পদ্ধতিতে ওয়াইন, পনির, বিয়ার প্রভৃতি উৎপাদন। বিভিন্ন কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তিও এই শাখার আলোচ্য বিষয়।
- গ্রে বা ধূসর জৈবপ্রযুক্তি
পরিবেশে প্রয়োগকৃত জৈবপ্রযুক্তি। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ দূর করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
- ব্রাউন বা বাদামি জৈবপ্রযুক্তি
শুষ্ক বা মরুভূমি এলাকার পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জৈবপ্রযুক্তি। এক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজ উৎপাদন করা হয় যা কঠিন প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম।
- ভায়োলেট বা বেগুনি জৈবপ্রযুক্তি
এই ক্ষেত্রটি জৈবপ্রযুক্তির আইনি, নৈতিক এবং দার্শনিক দিকগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত।
- ডার্ক বা অন্ধকার জৈবপ্রযুক্তি
সন্ত্রাসবাদে জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার, জীবাণু অস্ত্র তৈরি এই শাখার অন্তর্গত।যেমন- অণুজীব বা বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করে মানুষ, গবাদি পশু বা ফসলের রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষতি সাধন করা।
উপসংহারঃ
আধুনিক বিজ্ঞান মানব কল্যাণে জীবকে ব্যবহার করার কলাকৌশল একের পর এক আবিষ্কার করে চলেছে। এর দ্বারা আমরা পাচ্ছি, নতুন অধিক ফলনযুক্ত ফসল উদ্ভিদ, পরিবেশ হচ্ছে দূষণমুক্ত, মানব সমাজ বিভিন্ন ধরণের রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
মানুষ জীবের উৎপত্তি সন্ধানে সবসময় ব্যাকুল, আর একাজটি করতে যেয়ে, তারা জেনেছে জীবিত কোষের গঠন প্রক্রিয়া, বিভিন্ন অংশের কাজসহ এদের অণু পর্যায়ের গঠন প্রকৃতি (ultra-stucture) ও উপাদান সম্পর্কে। এরপর শুরু হয় কোষ থেকে কোষ তৈরী, তথা জীব তৈরী প্রযুক্তির উদ্ভাবন। আর এটা করতে যেয়ে আবির্ভাব ঘটে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির।
উদ্ভিদে টিসু কালচারের মাধ্যমে এক বা একাধিক কোষ থেকে প্রথমে গুচ্ছকোষ বা ক্যালাস সৃষ্টি এবং পরে স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্ভিদ তৈরীর ফলে চারা উৎপাদনে বীজের প্রয়োজনীয়তা অনেকটা কমে এসেছে।
প্রযুক্তি বাস্তবায়নে অনুজীবের ব্যবহার ব্যাপক। অণুজীব ব্যবহার করে বর্জ্য পদার্থ থেকে বায়োগ্যাস, প্রোটিন ও পানি শোধন পদ্ধতি বর্তমানে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া অণুজীব ব্যবহার দ্বারা বিভিন্ন প্রকার রোগ প্রতিরোধক টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক, বিভিন্ন এনজাইম ইত্যাদি তৈরি সম্ভব হয়েছে।


